আমাদের ফ্রিল্যান্সিং তারকা অনিকঃ প্রতিবন্ধিতা হার মানলো যার কাছে!

Home Blog Single

আমাদের ফ্রিল্যান্সিং তারকা অনিকঃ প্রতিবন্ধিতা হার মানলো যার কাছে!

শারীরিক-প্রতিবন্ধীরা অক্ষম নয়, বরং ‘ভিন্নভাবে সক্ষম’। অজ্ঞতাবশত আমাদের সমাজ মোটাদাগে এখনও তাদের অক্ষমই জ্ঞান করে। কিন্তু আশার কথা হলো দিনকেদিন এইসব ভ্রান্তির মূলোৎপাটন হচ্ছে। বিশেষ করে অনিক মাহমুদের মতো ব্যতিক্রমী ফ্রিল্যান্সাররা যখন দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং একজন মানুষ হয়েও তিনি আজ একজন তারকা ফ্রিল্যান্সার। তাই এটা কেবল তার ক্যারিয়ার-সফলতার গল্প নয়, একইসাথে প্রতিবন্ধীতার বিরুদ্ধে জয়। জানি, পাঠক হিসেবে আপনিও তাতে সহমত পোষণ করবেন। আসলে আউটসোর্সিং পেশাগত জগতে একটা বিশুদ্ধ বিপ্লব। তবে এটাকে তারচেয়েও বেশি বলা যায় তাদের ক্ষেত্রে যারা শারীরিক বা সাংসারিকভাবে চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় দিন যাপন করছিলেন। এই যেমন বাংলাদেশের সংসারপ্রিয় নারী বা প্রতিবন্ধীদের জন্য এটা সত্যিই একটা হাফ ছেড়ে বাঁচার উপায়। আমাদের আজকের আর্টিকেলটা অনিক মাহমুদের অধ্যবসায় আর সফলতা নিয়ে বর্তমানে যিনি আপওয়ার্কের একজন টপরেটেড ফ্রিল্যান্সার। একইসাথে ফাইভারে কাজ করছেন লেভেল ২ সেলার হিসেবে। বস্তুত, তিনি একটি অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন বলে তার চলমান জার্নিটাই এক গল্পের দাবিদার। আশা করি, গল্পটা কাজে দেবে আপনার!

পথ চলা 

শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও বুদ্ধির দিক থেকে পিছিয়ে থাকেননি অনিক মাহমুদ। তিনি সময়ের পালসটা ধরতে পেরেছেন। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর সম্ভাবনাময় সবাইকে যখন হাতছানি দিচ্ছিলো ঠিক তখনই তিনি তাতে সাড়া দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমার শুরুটা ছিলো ২০১৭ সালের শেষের দিকে। আমি একদিন ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে দেখি বাংলাদেশী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখানো হচ্ছে। আমি ঐটাতে খুব ইন্টারেস্টেড হয়ে পড়ি এবং এডমিশন নিয়ে ফেলি। তখন থেকেই আমার কাজ শেখার যাত্রা শুরু।“ 

আসলে কাজ জানলে তাকে আর খুব একটা কাজ খুঁজতে হয় না, কাজই তাকে খুঁজে নেয়। তাই আমরা দেখি মাত্র ৫-৬ মাসের মধ্যে অনিকের পেশাগত শুভ সূচনা। 

“২০১৮ সালের মাঝামাঝিতেই আমি আপওয়ার্কে ২৫ ডলারের একটা কাজ পেয়ে যাই। সেই প্রথম আমার যাত্রা শুরু হয় ফ্রিল্যান্সিং পেশায়।“ 

অনিকের ওস্তাদি 

বর্তমান ফ্রিল্যান্সিং দুনিয়ার বৃহত্তম দুই মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক এবং ফাইভারে যিনি এহেন উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তিনি ঠিক কোন কাজের কামেল তা জানতে নিশ্চয়ই ঔৎসুক আপনি। চলুন তার মুখেই শুনি,

“আমি শুধুমাত্র টি-শার্ট ডিজাইন নিয়েই কাজ করি। কেবল আপওয়ার্ক এবং ফাইভারে না, বিভিন্ন POD মার্কেটপ্লেসেও কাজ করি যেমন teepublic.com, teespring.com, redbubble.com এসব। এছাড়া বিভিন্ন Micro-stock সাইটেও কাজ করি টি-শার্ট ডিজাইন নিয়ে যেমন shutterstock.com, pngtree.com, pikbest.com 

কেন ফ্রিল্যান্সিং 

শারীরিক প্রতিবন্ধীতা এমন এক ব্যাপার যা কেউ পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েও সান্ত্বনা জ্ঞান করে না। তাহলে কি শাপে বর হলো অনিকের শারীরিক প্রতিবন্ধীতা? না তা তো বলাটাই অসমীচীন। আমরা বড়জোর বলতে পারি, জন্মগত বাঁধা অনিককে অসফলতায় বাঁধতে পারেনি। তিনি বলছিলেন, 

“এসএসসি পাশ করে আর পড়ার সুযোগ হয়নি। কলেজে ভর্তিও হয়েছিলাম। কিন্তু কপাল খারাপ, এই অটিজম নিয়ে কলেজের বিভিন্ন ফ্লোরে বিভিন্ন ক্লাস করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অগত্যা সাধের কলেজটা ছাড়তে হলো। আর একটা এইচএসসি সার্টিফিকেট না থাকলে যা হয়, প্রথাগত কোনো প্রতিষ্ঠানে জব পাওয়ার আশা করতেও পারিনি। ফলে আমার জন্য একটাই অপশন ছিলো বাসায় বসে কিছু করা। আসলে মনে মনে এমন কিছু চাচ্ছিলাম যেন আত্মনির্ভরশীল হবার পাশাপাশি আরও কিছু মানুষের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারি। ঠিক এই চিন্তা থেকেই ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে আসা। 

 

Anik Mahmud

কেমন ছিলো সেই পথচলা 

যেকোনো অসাধারণ সাফল্যের পথচলাটা বরাবরই কঠিন। আর অনিকের মতো সম্পূর্ণ হুইলচেয়ারনির্ভর কারো জন্য তা কতোটা চ্যালেঞ্জিং সেটা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাই কঠিন। বেটার উনার কথাগুলোই হুবহু তুলে ধরি।

“ফ্রিল্যান্সিং করতে চাইলে কম্পিউটারের বেসিকটা তো জানতেই হবে। আমি কি করতাম জানেন? সেই বাসা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ প্রতিদিন হুইলচেয়ার চালিয়ে যেতাম। রাস্তাটাও ছিলো জ্যাম-জঞ্জাটের! এরপর কম্পিউটার বেসিক প্লাস গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে যখন মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে আসলাম আমার সবথকে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো ইংরেজি। ইতোপূর্বের পড়াশোনা এসএসসি অব্দি থাকায় আমার ইংরেজিও ভালো ছিলো না। তবে আমার প্রতিবন্ধিতাই ছিলো প্রধান প্রতিবন্ধকতা। একজন সাধারণ মানুষের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসা আর একজন প্রতিবন্ধীর আসার চ্যালেঞ্জের ভেতর সকাল-সন্ধ্যার তফাৎ।” 

তিনি আরও বলেন, “কোনো সাধারণ মানুষের মতো আমার চলাফেরা নয়। ফলে কাজ শিখতে যাওয়া, অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ শেখা, এটা-ওটা মেইন্টেইন করা আমার জন্য রীতিমতো যুদ্ধস্বরুপ ছিলো!”

অনিকের অনুপ্রেরণা 

এ পেশায় আসার পেছনে কেউ আপনার প্রেরণা জুগিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 

“হ্যা অবশ্যই। আমি শুধুমাত্র একজন মানুষকে দেখেই উৎসাহ পেয়েছি তিনি আমাদের ফাহিম-উল-করিম ভাই। দুঃখের বিষয় হলো, তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি সারাজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।“ 

নেশা থেকে পেশা 

ক্রিয়েটিভ কাজের নেশা কতোটা ফলদায়ক হতে পারে তারও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের অনিক। তিনি বলেন,

“কম্পিউটারের প্রতি আমার নেশা ছিলো ছোটবেলা থেকেই। আরেকটা নেশা ছিলো ফটোশপের উপর। আমার ফটোশপে কাজ করতে দারুণ লাগতো। যখন দেখলাম এই দিকে কাজ করে টাকা আয় করা যায়, তখন নেশাটাই পেশা হয়ে দাঁড়ালো।“ 

স্কিল ডেভেলাপমেন্টের আলাপ 

অনিক একবাক্যে বিশ্বাস করেন যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট একটা অশেষ প্রক্রিয়া। চলুন জেনে নেই কি করে ইংরেজি স্কিল থেকে গ্রাফিক্সের স্কিলে শান দেন তিনি।

“আমি আমার ইংরেজি স্কিলটা ডেভেলাপ করেছি ইংলিশ মুভি দেখে, ইংলিশ নিউজ পেপার পড়ে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি তো কখনোই হাতছাড়া করতাম না। প্রতিদিন অন্তত ১০টা করে ওয়ার্ড মুখস্ত করতাম। সপ্তাহে ৬ দিন ৬০টা আর বাকি ১ দিন ঐ ৬০টা ওয়ার্ড রিভিশান দিতাম নিয়ম করে। এর পাশাপাশি আমি এখনও প্রতিদিন আমার কাজের ফাকে অন্তত ১ ঘন্টা করে হলেও ইউটিউব আর ইউডেমির মতো বিভিন্ন সাইট থেকে টিউটোরিয়াল দেখি।“ 

ফ্রিল্যান্সিংয়ের ভালো-মন্দ 

অন্যসব বিজনেসের মতো ফ্রিল্যান্সিংয়ে উত্থান-পতনের রিয়েলিটি মাথায় রেখে পথ চলাটা উত্তম বলে মনে করেন অনিক মাহমুদ। এছাড়া দু’-একটা প্রত্যাশিত ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, 

“কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও অনেক বায়ার আপনাকে খারাপ রিভিউ দেবে। আবার অনেক সময় আপনাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়ার পর আপনার থেকে ফাইল নিয়ে পুনরায় রিফান্ড চাইবে!” 

পাশাপাশি এর সেরা দিকটাও তুলে ধরেন তিনি, “ফ্রিল্যান্সিং একটি মুক্ত পেশা। তো এর বেস্ট পার্ট হলো আপনি যথেষ্ট স্বাধীনতার সাথে কাজ করতে পারবেন। এখানে আপনি নিজেই নিজের বস।“

ফ্রিল্যান্সিং চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিবন্ধিতা 

এ ব্যাপারে তিনি বলেন,”আসলে প্রতিবন্ধিদের জন্য প্রত্যেকটা পেশাই বেশ চ্যালেঞ্জিং। তো সেই হিসেবে ফ্রিল্যান্সিংটাও তাই। তবে এটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ যা তাদের সাথে ভালো যায়।“ 

ভবিষ্যত লক্ষ্য 

“আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা হচ্ছে আমি যেই কাজটি শিখে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছি সেই কাজ আমি অন্যদের শেখাতে চাই। আমি আমার নিজস্ব টিম নিয়ে গন্তব্যের পথে এগোতে চাই। বলতে পারেন এক্ষেত্রে অনেকটাই সফল আমি।“ 

হ্যা সত্যিই তাই। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫+ কর্মী রয়েছেন। এর পাশাপাশি প্রতিবন্ধিদের জন্য বিশেষ সেবা দিতে চান তিনি। 

“তাদের আমি ফ্রিতে ফ্রিল্যান্সিংটা শেখাতে চাই। সেক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য পেলে ভালো কিছু করতে পারবো।“ 

ক্লায়েন্ট তুষ্টির ৩টি উপায় 

একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এ ব্যাপারটাকে ভীষণ গুরুত্ব দেন অনিক মাহমুদ। টিপস হিসেবে তাই সাজেস্ট করেছেন যা ব্যক্তিগতভাবে মেনে চলেন তিনি। তার দেয়া টিপসগুলো হলোঃ 

  • ক্লায়েন্টের সাথে কখনোই বারগেটিং এ যাওয়া যাবে না 
  • ক্লায়েন্ট যতক্ষণ আপনার কাজে সন্তুষ্ট না হয় ততক্ষণ আপনার তার কাজের রিভিশন দিতে হবে।
  • সবসময় তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। তবে একইসাথে প্রফেশনালিজম ধরে রাখতে হবে। কখনোই নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করা যাবে না। 

নতুনদের জন্য টিপস 

এ ব্যাপারে কিছু ঠোঁটকাটা পরামর্শ দেন অনিক। তিনি বলেন, “আমি নতুনদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই ফ্রিল্যান্সিং পেশাটা কি আগে সেটা ভালোভাবে জেনে আসেন। কোনো গ্রুপে কোনো বড় ভাইয়ের হাজার ডলারের স্ক্রিনশট দেখে কখনোই আসবেন না। তাহলে ভালো কিছু করতে পারবেন না জানিয়ে রাখছি। আপনাকে আগে কাজ শিখতে হবে। কাজকে ভালবাসতে হবে। তাহলে দেখবেন কাজও একসময় আপনাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে এবং আপনার উপার্জনটাও আসতে শুরু করেছে।“ 

এর জন্য তিনি অসাধারণ দুটি বিষয়ের কথা বলেনঃ

  • এক, আপনার শরীর থেকে ৩নং হাতটা কেটে ফেলতে হবে আর সেটা হলো অজুহাত। এটা ভীষণ ক্ষতিকর।
  •  দুই, আজ থেকে ১০ বছর পর আপনি নিজেকে কোন পজিশনে দেখতে চান সেটা আজই ঠিক করে নিন। লক্ষ্য নির্ধারণে বিলম্ব মানে দিশেহারা পথচলা।

1111