সুমন সাহার ফ্রিল্যান্সিং জার্নি

Home Blog Single

সুমন সাহার ফ্রিল্যান্সিং জার্নি

ফ্রিল্যান্সিং জগতে তিনি এক পরিচিত নাম। দীর্ঘ দশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি সফলতা নিয়ে এসেছেন হাতের মুঠোয়। বলছি ফ্রিল্যান্সার সুমন সাহার কথা যিনি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং এ মনোনিবেশ করেছিলেন। বর্তমানে তিনি একটি কোম্পানির সফটওয়্যার রিলিজ ম্যানেজার পদে স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন। এত সফলতা পেয়েছেন তারপর ও তিনি নির্ভার নন। স্বপ্ন দেখেন দেশের তথ্য-প্রযুক্তি সেক্টরে তিনি অবদান রাখবেন, আর ও দক্ষ জনবল তৈরি করে নিবেন।

কখন এবং কিভাবে শুরু করা

২০১০ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর জব ফেয়ার হয়েছিলো। সেখান থেকে তিনি একটি কোম্পানিতে শিক্ষানবিশ হয়ে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি বলেন, ”ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে জানতে পারি ২০১০ সালের শেষ দিকে। ভার্সিটিতে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে একটি জব করছিলাম। সেখানে আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেকটা জানতে পেরেছিলাম। এছাড়া বিভিন্ন নিউজপেপার এবং ইন্টারনেট এ ঘাটাঘাটি করে ও বেশ কিছু ইনফরমেশন পাই। ২০১০ এ কৌতূহল বশত আমি ওডেক্স এবং ই-ল্যান্স এ একাউন্ট করি। যেটি বর্তমানে আপওয়ার্ক নামে পরিচিত। কিন্তু তখন কাজ পাচ্ছিলাম না। একটু হতাশ হয়ে গেলাম।” হতাশ হলে ও তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি বরং চেষ্টা করে গেছেন। 

তিনি বলেন, ”ঐ সময়টাতে বুঝতে চেষ্টা করি আমার কি ঘাটতি ছিল বা কি কি ইম্প্রুভমেন্ট এর দরকার ছিল। তাই তখন লোকাল মার্কেট এ জব কন্টিনিউ করার পাশাপাশি স্কিল বিল্ড এ কাজ করতে থাকি। এরপর আমি ২০১২ সালে আবার নতুন করে চেষ্টা করি। একাউন্ট আবার নতুন করে সাজালাম, কাজে বিড করার ট্রাই করলাম। এর কিছুদিন পর একটা কাজ পেলাম এবং এরপর সাথে সাথে নতুন আরেকটি কাজ আসে। আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে ২০১৩ সাল। ঐ বছরে আমি একটি ক্লায়েন্ট এর সাথে কাজ করার সুযোগ পাই। আমার কাজের উপর ঐ ক্লায়েন্ট খুব ইম্প্রেসড হয়েছিলেন। এরপর তার সাথে আর ও অনেক গুলো কাজে কোলাবরেট করার সুযোগ পাই। তিনি এখন আমার পারমানেন্ট ক্লায়েন্ট এবং তার সাথে কাজ করে চলছি।”

তিনি যেসব কাজ করে থাকেন

ফ্রিল্যান্সিং এ সুমন মোবাইল এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি এসুরেন্স নিয়ে কাজ করে থাকেন। তিনি বলেন, ”আমি মোবাইল এপ্স ডেভেলপমেন্ট এর বেশ কিছু প্রজেক্ট নিয়ে যুক্ত আছি। একটি এপ্লিকেশনের রানটাইমে বিভিন্ন আপডেট আসে, এর নতুন ফিচার আসে। এগুলো টেস্ট রান করা এবং কোয়ালিটি মেইন্টেইন করার যে সকল কাজ রয়েছে সে সব কাজ আমি দেখে থাকি। মুলত সফটওয়্যার অটোমেশন নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি।”  

যে সব স্কিলের প্রয়োজন

ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে স্কিলফুল মানুষের কদর বেশী। তিনি তার ফিল্ড রিলেটেড সার্ভিস দিয়ে আসছেন বহুদিন ধরে। তিনি বলেন, “আমি যেহেতু সিএসই স্টুডেন্ট ছিলাম, তাই আমি যে ফিল্ডে কাজ করছি তাতে আমার কোন সমস্যা হয় নি। যারা এ ফিল্ডে কাজ করতে চাইবে, তাদের প্রোগ্রামিং স্কিল থাকা লাগবে, সে সম্পর্কে নলেজেবল হওয়া লাগবে। এছাড়া আমি ভার্সিটিতে থাকা কালীন অবস্থায় জাভা, সি++, অব্জেক্টিভ সি এসব শিখেছি এবং তখন এগুলো পপুলার ছিল। বর্তমানের ট্রেন্ড অনুযায়ী, এপ্স ডেভেলপমেন্ট এ সুইফট, কোটলিন ব্যবহার হচ্ছে। এটি বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে টেকনলোজি ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা থাকা লাগবে। প্রোগ্রামিং এর বেসিক ক্লিয়ার করে রাখলে আপনি আইটির যেকেনো ক্যাটাগরিতে (যেমনঃ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিসাইন, এপ্স ডেভেলপমেন্ট) মানিয়ে নিতে পারবেন।” 

কেন ফ্রিল্যান্সিং

Suman Saha“লোকাল মার্কেটে যখন জব করি তখন ঢাকা শহরের জ্যাম, ছুটির দরকার পড়লে অফিসে ইমিডিয়েট সিনিয়র কাউকে জানিয়ে রাখা এসব কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো। একটি সময় যেয়ে আমার পক্ষে দুইটি কন্টিনিউ করা সম্ভব হয় নি। তাই ঐ জব ছেড়ে দিয়ে আমি ফ্রিল্যান্সিং কেই বেশী প্রেফার করি। এখন কথা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং কেন? এক কথায় এর পক্ষে বলতে গেলে বলা যায়, ফ্রিল্যান্সিং এ কাজ করার স্বাধীনতা। আপনাকে জবে কাজের পাশাপাশি অন্য যে সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হতো, ফ্রিল্যান্সিং এ সে সব নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি  ক্লায়েন্ট এর সাথে করা কমিটমেন্ট রক্ষা করে নিজের সুবিধা মতো টাইম গুছিয়ে কাজ করতে পারবেন, নিজের রুটিন সেট করতে পারবেন। এগুলো হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং এর এডভান্টেজ।”

ফ্রিল্যান্সিং এ শুরুর দিনগুলো

ফ্রিল্যান্সিং এ শুরুটা কেমন ছিল জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “ফ্রিল্যান্সিং এ শুরুর সময়টাতে আমরা নানা রকম প্রবলেম ফেস করে থাকি। এর মধ্যে বড় যেই প্রবলেম টি ছিল সেটি হচ্ছে ইন্টারনেট স্পিড। তখন ক্লায়েন্ট এর কাজ গুলো শেষ না করে কোথা ও যেতে পারতাম না। এখন ঢাকার বাইরে গেলেও ইন্টারনেট এভেলেবেল। এছাড়া পেমেন্ট গেটওয়ে তেমন স্ট্রাকচার্ড ছিল না। এখন সেই সুবিধা অনেক বেড়েছে। এরপর ইলেক্ট্রিসিটির প্রবলেম ও ছিল। তো শুরুর সময়ে সেই প্রবলেম গুলো এখন আর নেই বললেই চলে।” 

আপনার অনুপ্রেরণা 

“আমার সহধর্মিণী থেকে অনুপ্রানিত হয়ে আমি ২০১২ সালে দ্বিতীয়বারের মত ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার ডিসিশন নেই । সে ঐ সময়ে নিজে থেকে ফ্রিল্যান্সিং এর কিছু কাজের সাথে যুক্ত হয়েছিলো। এছাড়া বিভিন্ন নিউজপেপারে অনেক ফ্রিল্যান্সার দের নিয়ে নিউজ বের হতো। তাদের কে দেখেও ইন্সপায়ার হই। মনে চিন্তা আসে, তারা ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হতে পাড়লে আমি ও হতে পারবো। যেহেতু, আমার আগে থেকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে নলেজ ছিল, তাই আমার বিশ্বাস ছিল আমি নিজেকে এই ফিল্ডে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো। এখন বর্তমানে আমি আপওয়ার্কে কাজ করছি। আমার এখানে দুইজন পারমানেন্ট ক্লায়েন্ট আছে এবং পাশাপাশি কিছু খন্ডকালীন কাজ ও করে যাচ্ছি।”

ক্লায়েন্টকে খুশি রাখার তিনটি টিপস

যেহেতু তিনি বহুদিন ধরে মার্কেট প্লেসে কাজ করে যাচ্ছেন এর ফলে তিনি বিভিন্ন রকম ক্লায়েন্ট এর সাথে প্রজেক্ট কোলাবরেশনে যুক্ত হয়েছেন। তাই তাদের চাওয়া-পাওয়া, তাদের স্যাটিসফেকশন কিসের উপর ডিপেন্ড করে এ ব্যাপারে উনার কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়। এ সম্পর্কে সুমন বলেন, “প্রথমত ক্লায়েন্টের সাথে কমিউনিকেশন করার সময় যাতে কোন কমিউনিকেশন গ্যাপ না থাকে। প্রপারলি ক্লায়েন্টের রিকোয়ারমেন্ট বুঝে নিতে হবে এবং ক্লায়েন্টকে ও প্রজেক্টের রেগুলার ফিডব্যাক দিতে হবে।” 

“এরপর ক্লায়েন্টের সাথে যে কমিটমেন্ট করেছেন,সেটি মেইন্টেইন করতে হবে। যেই ডেডলাইন এর মধ্যে আপনি চুক্তিবদ্ধ তার আগে কাজ কমপ্লিট করতে হবে। এছাড়া কোন প্রবলেম ফেস করলে তা আগে থেকে ক্লায়েন্টকে জানিয়ে দিতে হবে।”

“লাস্টলি নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকতে হবে। প্রজেক্ট চলাকালীন সময় ক্লায়েন্ট আপনাকে অনেক ইনফরমেশন শেয়ার করবে। সেগুলোর প্রাইভেসি আপনার মেইন্টেইন করে কাজ করতে হবে।” 

“এছাড়া ধৈর্য, হার্ডওয়ার্ক, ডেডিকেশন থাকতে হবে কাজের প্রতি। এই গুন গুলো ফ্রিল্যান্সার এর মাঝে দেখতে চায় প্রতিটি ক্লায়েন্ট। এভাবে কাজ ডেলিভার করে গেলে ক্লায়েন্ট সবসময় আপনার উপর ইম্প্রেসড হবে।”

নতুনদের জন্য টিপস

“নতুন যারা ফ্রিল্যান্সিং শুরু করবে তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলবো তাড়াহুড়ো করে শুরু না করতে। কম্পিউটার চালানোর বেসিক স্কিল, ইংরেজীতে কমিউনেকেট করার স্কিল এগুলো থাকতে হবে। শুরুতে আমি ও কাজ পাই নি। ঐ সময় নিজের স্কিল ডেভেলপ এ আর ও মনোযোগ দিয়েছি। নতুন কিছু জানার আগ্রহ তৈরি করে নিতে হবে। রিসার্চ করার এবিলিটি থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে স্কিল দিয়েই আপনাকে মূল্যায়ন করা হবে; ভার্সিটির সার্টিফিকেট দিয়ে নয়। তাই স্কিলফুল হয়ে মার্কেটে এন্ট্রি করা হবে যথাযথ সিদ্ধান্ত।”

1111