এমরাজিনা ইসলাম, সফল উদ্যোক্তা, গ্রাফিক ডিজাইনার এবং চমৎকার একজন মা হওয়ার পাশাপাশি কর্মরত রয়েছেন পেয়নিয়ার বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর পদে। প্রতিষ্ঠা করেছেন এমরাজিনা টেকনলজিস নামের তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি। কাজ করছেন তথ্যপ্রযুক্তিতে মেয়েদের সম্পৃক্ত করা নিয়ে।

এছাড়াও জড়িত আছেন ছোট-বড় বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে। 

 বেসিস ফ্রিল্যান্সিং এওয়ার্ড 2013 জয়ী দেশের অন্যতম সফল নারী ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এক নামে- পরিচিত এই অসাধারণ মানুষটির আজকের অবস্থানে আসার পেছনের গল্পটিও চমকপ্রদ।

ছোটবেলায় চিত্রশিল্পী হতে চাওয়া এমরাজিনা ইসলাম পড়াশোনা করেছেন ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে। আঁকিবুঁকির শখ থেকে চারুকলায় সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে। 

স্বাবলম্বী হওয়ার যাত্রায় এমরাজিনা ক্যারিয়ার শুরু করেন টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে। পড়াশোনার পাশাপাশি একসময় করতেন শিক্ষকতা। তবে আর্থিক স্বাধীনতা, নিজের পছন্দের কাজ আর সৃজনশীলতার সুযোগ থাকায় আগ্রহী হন ফ্রিল্যান্সিংএ।

একসময়ের আঁকাজোকার আগ্রহকে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় পরিনত করতে নিয়েছেন গ্রাফিক ডিজাইনের বিভিন্ন প্রশিক্ষনও । 

পেশাদার ফ্রিল্যান্সিং জগতে  শুরুটা করেছিলেন মাত্র ২৫ ডলারের ছোট্ট কাজ দিয়ে। ২০১১র জানুয়ারিতে ডিজাইনার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করেন তৎকালীন ওডেস্কে(বর্তমান আপওয়ার্ক)

প্রায় তিন মাস চেষ্টার পর প্রথম কাজটা পান। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে  হয়নি। প্রথমদিকে লোগো, ব্রশিউর, ব্যানার, ওয়েবসাইট,টিশার্ট ইত্যাদি ডিজাইনের কাজ করতেন বেশি।  একসময় ক্রিয়েটিভ ডিজাইনের পাশাপাশি প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে ইল্যান্সে কাজ করতে শুরু করেন। গ্রাফিক ডিজাইনে পারদর্শী এমরাজিনা কাজ করেছেন ভয়েস ওভার, বিজনেস সাপোর্ট নিয়েও।  

শুরুতে নিজে কাজ  করলেও একসময় কাজের চাপ আর ক্লায়েন্ট চাহিদায় স্টার্ট করেন প্রজেক্ট আউটসোরসিং। ২-৩ জনের ছোট্ট টিম থেকে ধীরে ধীরে তৈরি করেন ক্রিয়েটিভ কিটেন্স নামের এজেন্সি যা বর্তমানে ১০জন এমপ্লয়ি নিয়ে এমরাজিনা টেকনোলজিস।

মূলতঃ  ডিজাইন নিয়ে কাজ করলেও এমরাজিনা তার এজেন্সির মাধ্যমে ব্যাকএন্ড অফিস অপারেশন, ডাটা এন্ট্রি, রিসার্চ, থ্রিডি ইমেজ, ফটো- ভিডিও এডিটিং ইত্যাদি সার্ভিসও দিয়ে থাকেন। 

এছাড়া ২০১৬ থেকেই যুক্ত আছেন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সল্যুশন পেয়নিয়ারের সাথে। বর্তমানে সংস্থাটির বাংলাদেশ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর দায়িত্ব পালন করছেন।  

ফ্রিল্যান্সিং কেন?

একসময় করেছেন শিক্ষকতা, সুযোগ ছিল কর্পোরেটেও ক্যারিয়ার গড়ার। সব ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং এ কেন, এ প্রশ্ন করা হলে এমরাজিনা ইসলাম বলেন, ‘টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে কাজ করার সময় ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারি।  সেসময় পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতাম। একটা সময় আঁকাআঁকির আগ্রহ থেকে গ্রাফিক ডিজাইন শেখা শুরু করি। ফ্রিল্যান্সিং এ তখনো খুব ভাল ধারণা ছিলোনা, তবে এখানে পছন্দের ডিজাইনিং নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে এটা জেনেই আগ্রহী হই।

মূলত ভাল লাগার কাজ করতে পারব এটা ছিল ফ্রিল্যান্সিং এ আসার টার্নিং পয়েন্ট। একইসাথে যখন দেখলাম ভাল লাগার জায়গায় কাজ করে গতানুগতিক অন্য পেশা থেকে বেশি উপার্জন করতে পারছি, তখন পেশাদার ফ্রিল্যান্সিংএ ক্যারিয়ারের ডিসিশন নিই।” তবে ডিজাইনার বলে আমার জন্য ব্যাপারটা সহজ ছিল এটা মনে করিনা। বৈচিত্র্যের এ পেশায় সব ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে। 

 আপনি ফটোগ্রাফিতে ভাল হলে, ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, হিসাবনিকাশে পাকা হলে, বুককিপিং বা ফ্রিল্যান্স একাউন্ট ম্যানেজার আবার ফিটনেস নিয়ে সচেতন হলে কাজ করতে পারেন ফিটনেস কোচ হিসেবেও!

আমি মনে করি, নিছক শখ বা ভাল প্রফেশনাল  স্কিল থাকলে মোটামুটি সবার জন্যই ফ্রিল্যান্সিং এ ক্যারিয়ার গড়া খুব কঠিন কিছুনা।”

গ্রাফিক ডিজাইনার হতে কি ধরনের স্কিল থাকা দরকার বলে মনে করেন?

“ ফ্রিল্যান্সিং এ গ্রাফিক ডিজাইন অন্যতম বড় ক্ষেত্র। লোগো ডিজাইন, কালার কারেকশন করার মত হাজার ধরনের কাজ করা যায়। তবে মোটামুটি  দক্ষতায় ভাল কিছু করা কঠিন।  ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ বা ফটো এডিটের মত আপাত সাধারণ কাজেও জানতে হবে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো। যদি মনে করেন এলিমেন্ট এড করা মানে ছবি কেটে বসিয়ে দেয়া তাহলে স্কিলের ঘাটতি আছে। আপনাকে জানতে হবে বিভিন্ন শেড কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। আলো-ছায়ার কারেকশন কি, ছবি কতটা রিয়েলিস্টিক এমনকি ছবিতে কাছের বা দূরের বস্তু কিভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয় সেসবকিছু।’

আপনি গ্রাফিক ডিজাইনার তার মানে আপনার সৌন্দর্যবোধ অন্যদের চেয়ে ভাল।

এছাড়া ডিজাইনিং এ ভাল করতে চাইলে অবশ্যই ডিজাইন, কালার সেন্স,বিভিন্ন রকম সফটঅয়্যারের ব্যবহার খুব ভালভাবে জানা প্রয়োজন। 

সবসময় চেষ্টা করতে হবে নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখার। জানতে হবে লেটেস্ট ডিজাইন ট্রেন্ড, কাস্টমার চয়েজ ইত্যাদি।”

ফ্রিল্যান্সিং এ ডিজাইন ক্যারিয়ার?

এমরাজিনা ইসলাম‘আমি মনে করি ৯-৬টার অফিস আর ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইন ক্যারিয়ারে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ চাকুরীজীবীর জীবন যেরকম রুটিন মোড়া, একজন ফ্রিল্যান্সারের ডেইলি রুটিন মোটেও তা না। কাজের চাপ থাকলে ১৪-১৫ ঘণ্টা তো বটেই এমনকি দেখা যায় ঈদের দিন ও কাজ করতে হয়! ভাল কাজে বিড করার জন্য রাত জাগা ফ্রিল্যান্সারদের খুব সাধারণ ব্যাপার! 

শুরুর দিকে আমি রোবটের মত কাজ করতাম! যা আসলে মোটেও ভাল অভ্যাস ছিলোনা। 

সুতরাং, ফ্রিল্যান্সিং এ বেটার করতে চাইলে প্রফেশনাল আর পার্সোনাল লাইফ ব্যালেন্সিং এ ভাল হতে হবে। 

এটাও মনে রাখতে হবে, মুক্তপেশা বললেও ফ্রিল্যান্সিং এ কাজে অবহেলার কোন সুযোগ নাই।

আর আপনি যদি আরাম প্রিয় মানুষ হন বা খামখেয়ালি করে কাজ করবেন ভেবে থাকেন তাহলে বলতে  হবে ফ্রিল্যান্সিং আপনার জন্য না। পূর্ণ পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করলেই এখানে ভাল কিছু করা সম্ভব।’

একজন ফ্রিল্যান্সারের মাস্ট স্কিল কি মনে করেন?

‘ফ্রিল্যান্সিংকে আমার ওয়ানম্যান জার্নির মত মনে হয়। এখানে কাজে বিড করা থেকে কভার লেটার লেখা, ক্লায়েন্ট নেগোসিয়েশন , প্রজেক্ট কমপ্লিট ইত্যাদি সব একাই সামলাতে হয়। এই এতকিছু ম্যানেজ করার মত ধৈর্য, দক্ষতা আছে কিনা এটা আমার কাছে সবচে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বিশেষ করে কাজের ডেডিকেশন, স্ট্রেস নেয়ার অ্যাবিলিটি, কমুনিকেশন স্কিল, কাজের প্রতি অনেস্ট থাকা প্রত্যেকটাই একজন ফ্রিল্যান্সারের মাস্ট স্কিল বলে মনে করি।’

ফ্রিল্যান্সিং এর চ্যালেঞ্জ

সোলো ফ্রিল্যান্সার থেকে প্রফেশনাল এজেন্সি, এমরাজিনা ইসলামের যাত্রা সহজ ছিলোনা মোটেও। 

পারিবারিক জীবনের ঝক্কি-ঝামেলা, দায়িত্বের চাপ ইত্যাদি সামলিয়ে পেশাদার ফ্রিল্যান্সার হওয়ার পথে মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন জটিলতার। 

এমরাজিনার মতে, মেয়েদের জন্য অন্যান্য যেকোনো পেশার চাইতে মুক্তপেশা ফ্রিল্যান্সিংএ সুযোগ বেশি থাকলেও প্রতিবন্ধকতাও কম না। বিশেষ করে যখন সংসার, সন্তান আর পরিবারের ছোটবড় যেকোনো ইস্যুতে এখনো মেয়েদের মূল দায়িত্ব সামলাতে হয়। 

পেশাদার ক্যারিয়ার গড়তে হলে ফ্রিল্যান্সিং এ সময়মত কাজের ডেলিভারি , ঠিকমত প্রজেক্ট কমপ্লিট আর নিয়মিত ক্লায়েন্টের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা মূল শর্ত । যা এদেশের প্রেক্ষাপটে ফিমেল ফ্রিল্যান্সারদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। 

এছাড়াও পারিবারিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কাজের পরিবেশ আর সাপোর্টিভ ফ্যামিলি ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং এ ভাল করা মেয়েদের জন্য কষ্টকর। তাই ফ্রিল্যান্সিংএ পরিবারের সহযোগিতা পেলে  চমৎকার ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।

মেয়েদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং কেন বেটার

“ ফুলটাইম ফ্রিল্যান্সিং অন্য যে কোন পেশার মতই চ্যলেঞ্জিং। তবে বাংলাদেশের সামাজিক কন্ডিশনে এক্ষেত্র মেয়েদের সম্ভাবনাময় পেশা। 

যাতায়াতের দুর্ভোগ থেকে অফিস পলিটিক্স, বা পারিবারিক ইস্যু; 

এমরাজিনা মনে করেন, অন্য যেকোনো পেশার চাইতে ফ্রিল্যান্সিং এ মেয়েদের এসব ভোগান্তি কম থাকে। 

“কর্পোরেট জবের চতুর্মাত্রিক প্রেশার সামলানো, জব সিকিউরিটির হ্যাসেল ইত্যাদি আমাদের দেশের মেয়েদের ক্যারিয়ার গ্রোথ অনেকটাই রুদ্ধ করে দেয়। অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সিং এ  নিজেদের সুবিধা মত কম্ফোর্ট জোনে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। 

এমনকি কুকিংএ ভাল বা লেখালেখিতে পারদর্শী, দৈনন্দিন জীবনের এসব দক্ষতা দিয়েও একটা মেয়ে চাইলে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারে।’

একজন নতুন ফ্রিল্যান্সার কিভাবে কাজের প্রস্তুতি নিতে পারে বলে মনে করেন?

‘‘আর যাই করুন প্রথমে কোন মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট করবেননা! তারচেয়ে রিসার্চ করেন! 

ধরুন, আপনি একজন রাইটার, তাহলে প্রথমে খুঁজবেন কোন প্ল্যাটফর্মে রাইটিং এর কাজ পাওয়া যায়। এরপর দেখবেন কোন ধরনের কাজ বেশি পোস্ট হয়, আপনি কোনটা ভাল পারেন ইত্যাদি। 

এসব প্ল্যাটফর্মে যারা ভাল করছে, হাইয়েস্ট রেটিং-ফিডব্যাক পেয়েছে তারা কিভাবে নিজেদের প্রোফাইল সাজিয়েছে, কিভাবে নিজেদের উপস্থাপন করছে তাও ভালমত রিসার্চ করবেন। 

 এরকম ঘাঁটাঘাঁটি করলেই মোটামুটি  কাজের আইডিয়া পেয়ে যাবেন। এরমধ্যেও অনেককিছুই অপরিচিত লাগবে। গুগল তখন আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু!

প্রয়োজনীয় যেকোনো তথ্যর জন্য গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব ঘাঁটলেই নানা রিসোর্স পাবেন। সেগুলো স্টাডি করেন,পাশাপাশি নিজের ব্লগ খুলে তাতে লেখালেখি শুরু করতে পারেন।

 আবার আপনি যখন অন্যান্য রাইটারদের প্রোফাইল রিসার্চ করছেন, তখনো দেখবেন তারা পছন্দের বিষয়ে পিডি এফ, ব্লগ ব্যবহার করে বিভিন্ন লেখার পোর্টফলিও তৈরি করেছে। অন্যদেরটা দেখুন, নিজে লিখুন, তবে আবার কপি করবেন না যেন! 

রিসার্চ আর শেখার এ পর্যায়ে এসেও যদি পোর্টফলিও না দাঁড়া করাতে পারেন,তবে মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট করার দরকার নাই। আগে সমৃদ্ধ পোর্টফলিও তৈরি করায় মনোযোগ দিন।

নিউজপেপার, ওয়েবসাইটসহ, লোকাল ক্লায়েন্টদের জন্য বিভিন্ন টপিকে লেখালেখির কনফিডেন্স আসলে এবার পালা আপনার প্রোফাইল খোলার। প্রফেশনালি নিজের প্রোফাইল সাজাবেন এবং মনে রাখবেন, ফ্রিল্যান্সিং এ কাজ পাওয়াটা মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং কাজ কমপ্লিট করে ভালভাবে ডেলিভার দেয়াটাই হবে আপনার আসল লক্ষ্য। এর জন্য সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন।